কিভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন আমার জীবনধারা পাল্টে দিয়েছে

কিভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন আমার জীবনধারা পাল্টে দিয়েছে

1920 1080 bylc-blog-admin

মোঃ আসিফ উদ্দিন

বাবা ফসল ফলাতেন। সেই বর্ষায় ঝুম বৃষ্টি নামতো, বাবা তার জমির গভীরে লুকায়িত গুপ্তধনের সন্ধানে নেমে পড়তেন। বাবা বলতেন যে, কারো রোদের তাপে বের হওয়া ঘামগুলা যদি আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ধুয়ে না যায়, তাহলে সে জীবনের মর্মার্থ বুঝতে পারবে না।

আমিও বাবার সাথে যেতাম। দেখতাম, ঝুম বৃষ্টিতে বাবা লাঙল টানছেন, মাটিগুলো দলা পাকিয়ে উঠে আসছে ভেতর থেকে। বর্ষার মৌসুমে চারদিক দিয়ে ধান রোপণের হিড়িক পড়ে যেত, আর সেচেরও দরকার ছিলোনা। আকাশ থেকে নামা জলধারাই কৃষকদের প্রাণের উৎস।

কিন্তু এমন ধারা আর বেশি বছর চলেনি। বাবার চেহারাকে ভারাক্রান্ত দেখতাম। কারণ, যেই মৌসুমে ঝুম বৃষ্টি নামার কথা, সেই মৌসুমেই কড়া রোদে সবার গা পুড়ে যাবার যোগাড়। নিয়মিত বৃষ্টিধারা অনিয়মিত হতে শুরু করলো। ফলে সময়মতো ফসল রোপণ করা সম্ভব হলো না। খরাভাব দেখা দেয়ার কারণে প্রত্যাশিত ফসলও পাওয়া গেলো না।

প্রথম দিকে কৃষোক্রা একে একটি আশীর্বাদহীন বছর হিসেবে ধরে নিলো। কিন্তু তাদের কে বুঝাবে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের নির্দেশক? তবে তারা শীঘ্রই বুঝতে পারলো যে সময়মত বৃষ্টি হয়তো আর হবেনা। ফলে বিরাট এলাকা জুড়ে গভীর নলকূপ বসানোর আরম্ভ হলো।

কিন্তু এতো জলের প্রয়োজন কি আর সেচের পানি দিয়ে মেটে? অতিরিক্ত পানির ব্যবহারের কারণে দুই তিন বছর পর নলকূপ দিয়েও পানি বেরুতো না। পরে জানলাম, জলবায়ুর পরিবর্তন মাটির তলার পানির স্তরও নিচে নামিয়ে দিয়েছে।

বাবা মারা গেছেন। বিলে যখন কালেভদ্রে যাই, দেখি যে গাছগুলোর তলায় বসে আমরা গ্রীষ্মের দিনে বিশ্রাম নিতাম, তার একটিও নেই। এখন কড়া রোদে চামড়া পুড়ে যায়, ছাতা ছাড়া দাঁড়ানো যায় না। গ্রামবাসী সেচের মৃদুমন্দ পানি কাড়াকাড়ি করে ধান রোপণের কাজ সারেন, কিন্তু খাঁ খাঁ রোদের চক্করে পড়ে তারা গোলা ভরা ধানের প্রত্যাশা স্বপ্নেও করতে পারেন না।

এসব দেখে আর বাবার মতো জমিতে নেমে ফসল ফলাতে সাহস হয়না। বাজার থেকে চড়া দামে চাল কিনে আনি, আর এসব চাল খেয়ে আমার মা কখনোই আত্মতৃপ্তি পান না।

আমার অজান্তেই জলবায়ুর পরিবর্তন আমার জীবনধারা পাল্টে দিয়েছে।

শুধু আমার না, পুরো গ্রামবাসীর।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Seo wordpress plugin by www.seowizard.org.