কোভিড-১৯: পরবর্তী অর্থনৈতিক ভাবনা ও তরুণদের করণীয়

কোভিড-১৯: পরবর্তী অর্থনৈতিক ভাবনা ও তরুণদের করণীয়

1920 1080 Fatimatuj Johora Siddiqua

কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ তথা বিস্তার এ মুহূর্তে পুরো বিশ্বকে থামিয়ে দিয়েছে। কোয়ারেন্টিনের কারণে সাধারণ জীবনযাপনে চলমান অচলাবস্থা শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রভাবিত করছে শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সের সকলকে। বিশেষভাবে তরুণসমাজের মধ্যে বিরাজ করছে বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা এবং অস্থিরতা। এমন অবস্থায় সহিঞ্চু হয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এবং আগামীর জন্যে নিজেদের প্রস্তুত করা সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে যুব সমাজকে যুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশীপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) সম্প্রতি অনলাইনে বিওয়াইএলসি সাউথ এশিয়া রেসিলিয়েন্স সামিট ২০২০ এর আয়োজন করে। উক্ত সামিটের সমাপনী দিনে মুলবক্তা হিসেবে যোগদান করেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, বিশ্বের মেডিকেল সরঞ্জামাদি প্রস্তুতকারী অন্যতম প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিক এর চেয়ারম্যান ও সিইও এবং বিশ্বের অন্যতম টেক জায়ান্ট ইন্টেল এর বোর্ড চেয়ারম্যান ওমর ইশরাক। এই অনলাইন সামিটের সমাপনি সেশনে তিনি কথা বলেন তার ক্যারিয়ার, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাসহ তরুন সমাজের জানতে চাওয়া আরো অনেক বিষয় নিয়ে। সেশনের সঞ্চালক হিসেবে ছিলেন বিওয়াইএলসির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ইজাজ আহমেদ। সেশনে জনাব ওমর ইশরাকের প্রতি সঞ্চালক ইজাজ আহমেদ এবং উৎসুক অংশগ্রহণকারীদের করা প্রশ্নগুলোকে নিচে সামান্য পরিমার্জিত রূপে উপস্থাপন করা হলোঃ
প্রশ্নঃ উন্নত বিশ্বের তুলনায় স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো অনেকটা পিছিয়ে আছে। অধিক জনসংখ্যার বিপরীতে যেখানে কোভিড-১৯ কে মোকাবেলা করার জন্যে ভেন্টিলেটর ব্যবস্থারও অভাব রয়েছে, সেখানে এসব দেশের সরকারের মহামারী মোকাবেলায় কি কৌশল অবলম্বন করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
উত্তরঃ কোভিড-১৯ কে মোকাবেলা করার জন্য ভেন্টিলেটর ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি যথেষ্ট সংখ্যক আইসিউ, ডাক্তার, নার্স এবং সর্বপোরি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের সব অংশকেই দরকার। তবে, আমি মনে করি, বাংলাদেশ, ভারতের মত বহুল জনগোষ্ঠীসম্পন্ন দেশে সরকারের পক্ষ হতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এসবই অধিক কার্যকর। জনগণকে ভালোভাবে সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং এর নিয়ম সম্পর্কে জানানো এবং তা মানতে বাধ্য করা, পরিষ্কারভাবে হাত ধোয়া, জনসমাগম এড়িয়ে চলা ইত্যাদি এসব দেশের জন্য সর্বোত্তম পন্থা। তবেই, কোভিড-১৯ এর ফলে সৃষ্ট খাদ্যাভাব, অর্থনৈতিক মন্দা এসব সমস্যা নিয়ে সরকারের পক্ষে বেশি কাজ করা সম্ভব হবে।
প্রশ্নঃ সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আপনি জানিয়েছেন যে, আপনার প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিক, ভেন্টিলেটর প্রস্তুতের কাজকে আরো বেশি ত্বরান্বিত করছে এবং শীঘ্রই আয়ারল্যান্ডের কারখানা হতে সপ্তাহে ১,০০০টি করে ভেন্টিলেটর ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হবে। এছাড়াও, মানুষের কল্যাণে আপনি একটি ভেন্টিলেটর মডেলও বিনামূল্যে উন্মুক্ত করেছেন যা ইতোমধ্যে প্রায় ৭০,০০০ এর মতন মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। এ অবস্থায় এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের প্রতিক্রিয়া কেমন?
উত্তরঃ হ্যাঁ, আমাদের এই মডেল এখন প্রায় ১ লক্ষের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যা হলো ভেন্টিলেটর উৎপাদনের উপকরণ সবার কাছে নেই এবং এসবের উৎস খুবই সীমিত। ভেন্টিলেটর তৈরির ব্যাপারে সর্বপ্রথম এশিয়ান দেশসমূহই আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছে। আমরা তাই এখন এমন সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছি যারা বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন করে আসছে এবং উপকরণ পেলে ভেন্টিলেটর নিজেরাই প্রস্তুতে সম্ভবপর হবে। যেমনঃ তাইওয়ানের ফক্সকন, ভিয়েতনামের ভিন গ্রুপ, বাংলাদেশের ওয়াল্টন, এবং ভারতের টাটা কোম্পানীর মতন কোম্পানী, যারা নিজেদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে এই সেবাকে ছড়িয়ে দিতে পারবে।
প্রশ্নঃ আপনার কি মনে হয়, ভেন্টিলেশনের মতোই চিকিৎসায় ব্যবহৃত অবকাঠামো সমূহকে স্বল্প বা বিনামূল্যে প্রদান করে ভবিষ্যতে আমরা ঘরেই সুচিকিৎসার ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবো?
উত্তরঃ প্রথমত, ওপেন সোর্স ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা অনেক স্বল্পমূল্যের একটা ব্যবস্থা। কিন্তু যখন মহামারী কিংবা খুব জটিল অবস্থা সৃষ্টি হয় তখনই ভেন্টিলেশন প্রদান করা হয় রোগীদের, যখন কিনা তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। শুধু স্বল্পমূল্যের ভেন্টিলেটর ব্যবহারের মাধ্যমেই এমন রোগীদের সেবা দেওয়া সম্ভব নয় বরং ভবিষ্যত মোকাবেলার জন্য তিনটি বিষয়ে আমাদের নজর দেওয়া জরুরী; সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক প্রশিক্ষন এবং কারিগরী ব্যবস্থার উন্নয়ন। সামগ্রিক বিষয় সমূহের উপরই নির্ভর করে আসলে কে কতো ভালোভাবে এসব মহামারীকে মোকাবেলা করতে পারছে তা।
প্রশ্নঃ উন্নত দেশসমূহের সাথে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের অর্থনৈতিক ব্যবধানকে বিবেচনায় রেখে এসব দেশসমূহে বর্তমানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নিয়ে আপনার মতামত কি এবং এই অবস্থাকে কিভাবে মোকাবেলা করা উচিত বলে মনে করেন?
উত্তরঃ যদিও আমি এব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই, তবে দক্ষিণ এশিয়ার মতন জনবহুল এলাকায় লকডাউনের ফলে অর্থনৈতিক মন্দা আসলেও এর মাধ্যমেই ভাইরাসকে প্রশমন করা জরুরী। এখন আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক-ব্যবসায়ীদের নিজেদের লাভের চিন্তা কম করে অর্থনৈতিক তারল্যের উপর নজর দিয়ে একে অপরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার মাধ্যমেই এই সমস্যাকে সামাজিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে বলে আমি মনে করি।
প্রশ্নঃ এই স্থবির এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে বিশেষভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মতন প্রতিযোগিতাপূর্ণ অঞ্চলের তরুণ যারা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
উত্তরঃ আমি মনে করি, তরুণদের বিষণ্ণতায় না ভুগে ইতিবাচকভাবে বর্তমান অবস্থাকে দেখা উচিত। আমি মনে করি, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নিজের অবস্থানকে দেখা উচিত। নিজের উদ্যোগে স্বল্প-সুবিধাপ্রাপ্ত কিংবা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করা উচিত। এর মাধ্যমে মানবিক গুনাবলীর চর্চার পাশাপাশি তরুণরা সমন্বয়, সংযোগ এবং দুর্যোগ মোকাবেলার মতন গুনাবলীসমূহ অর্জন করতে সক্ষম হবে যা এই বয়সে টাকা আয়ের থেকেও ভবিষ্যতের জন্য বেশি দরকারী।
প্রশ্নঃ আপনার সাফল্যের পেছনে আপনার এই অঞ্চলে বেড়ে ওঠার কোন প্রভাব কি রয়েছে এবং এই অঞ্চলের একজন ২২ বছরের তরুণ যদি ভবিষ্যতে আপনার মতন সফল হবার স্বপ্ন দেখে তবে তার কি কি বিষয়ের দিকে নজর দেয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন?
উত্তরঃ যেহেতু আমি টেকনোলজির সাথে জড়িত, তাই আমি সবসময় ভেবেছি কোন কাজের মাধ্যমে অন্যের কাজে কিংবা জীবনে আমার কাজটি মান সংযোজন করতে পারে। সেটা স্বাস্থ্যক্ষেত্র হোক কিংবা যেকোন ক্ষেত্রেই, যে কাজ অন্যের কাজে কিংবা জীবনযাপনে মান সংযোজন বা ভ্যালু এডিশন করতে পারবে তখন ব্যবসায়িক ভাবেও সে সফল হবে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি থেকেও বড় একটি বিষয়, এটি কাঠামোগতভাবে চিন্তা থেকে শুরু করে সঠিকভাবে পূর্ব এবং পরবর্তী পরিকল্পনাও করতে শেখায়, তাই এসব বিষয়কে ব্যবসায়িক জীবনেও কাজে লাগাতে হবে। তাই নিজের প্রতি কঠোর না হয়ে নিজের গুণাবলীর উপর গুরুত্ব দিয়ে, সেসবকে কাজে লাগিয়ে অন্যের কাজেও মান সংযোজন করার মাধ্যমেই নিজের সফলতা অর্জন করা যায় বলে আমি মনে করি।
প্রশ্নঃ দক্ষিণ এশিয়ার তরূণদের বর্তমান ও ভবিষ্যত উন্নয়নের জন্য কোন তিনটি বিষয়কে আপনি প্রাধান্য দিবেন?
উত্তরঃ পরামর্শ হিসেবে এ অঞ্চলের তরুণদের জন্য আমি তিনটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করবো। সঠিক ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, উচ্চারণ ও ব্যবহার, কেননা এটি বৈশ্বিক একটি ভাষা। আর কমিউনিকেশন বর্তমান যুগে সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি। দ্বিতীয়ত, মত এবং দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র সম্পর্কে দক্ষিণ এশিয়ার তরূণদের এখনই শেখা এবং তা নিজেদের মধ্যে ধারণ করা উচিত বলে আমি মনে করি। আর সর্বশেষে, তাদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে, ভিন্ন ভিন্ন গুনাবলীর ইতিবাচক মানুষের সাথে নিজেকে জড়িত রাখার, তোমরা তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানো এবং শিখতে থাকো, অপমানিতবোধ হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। ক্ষমাশীল হয়ে, ইতিবাচকভাবে অন্যদের দেখতে শিখো। পরবর্তীতে এসবই নিজের সাফল্যের পেছনে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ দিবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Seo wordpress plugin by www.seowizard.org.