আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন নাতো?

আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন নাতো?

1920 1280 Ahmed Sabbir

ডেবিড ক্যাস্লার মানসিক বিষণ্ণতা বিষয়ে বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম সেরা একজন এক্সপার্ট। তিনি তার বই “অন গ্রিফ এন্ড গ্রিভিংঃ ফাইন্ডিং দ্যা মিনিং অফ গ্রিফ থ্রু দ্যা ফাইভ স্টেজ অফ লস” এ বিষণ্ণতা কি, কিভাবে বিষন্নতা নিয়ে আমাদের চিন্তা করা উচিত এবং কি করলে আমরা বিষণ্ণতা থেকে বের হয়ে আসতে পারবো সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। সম্প্রতি তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ। নিচে সাক্ষাৎকারটির চুম্বকাংশ কিঞ্চিৎ পরিমার্জিত করে তুলে ধরেছেন বিওয়াইএলসির  বিবিএলটি প্রোগ্রামের চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী, মার্কেটিং ও কমিউনিকেশন টিমের ডেপুটি ম্যানেজার আহমেদ সাব্বির। 

 

প্রশ্নঃ করোনার সময়টিতে অনেকদিন বাসায় বন্দী থাকার ফলে মানুষের মাথায় নানা রকমের চিন্তা ও নানা অনুভূতি কাজ করছে। এই অনুভূতি গুলোকে কি আপনি বিষন্নতা বলবেন?

 

হ্যাঁ, আপনি হয়তো বিভিন্ন রকমের বিষন্নতায় ভুগছেন। পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে এবং আমরা জানি এটা সাময়িক, কিন্তু আমরা তা বিশ্বাস করতে চাই না। আমরা জানি অনেক কিছুই বদলে যাবে। যেমন, ৯/১১ এর পরে বিমানবন্দরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষের বদলে গেছে। পৃথিবী বদলাতে থাকবে, সাথে সাথে আমাদেরও বদলাতে হবে। হয়তোবা ভবিষ্যৎ পৃথিবী এখনকার মতো থাকবে না। বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা, একে অন্যজনের সাথে দূরত্ব বৃদ্ধির মত বিষয় আমাদেরকে দেখতে হচ্ছে এবং আমরা বিষন্নতায় ভুগছি। এক কথায় বলতে গেলে বর্তমান সময়ের সাথে আমরা পরিচিত না, যা আমাদের মাঝে নানা ধরনের খারাপ লাগার অনুভুতি তৈরি করছে। 

 

প্রশ্নঃ তাহলে কি আপনি বলছেন আমরা নানা ধরনের বিষন্নতায় ভুগছি?

 

হ্যাঁ, আমরা অনেকেই আগাম বিষন্নতায় ভুগছি।  আগাম বিষণ্ণতা বলতে আসলে এমন বিষণ্ণতাকে বুঝায় যখন আমরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতে কি হবে সেটা নিয়ে খুব চিন্তা করি বা ভয় পাই। যেমন, মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করা। আমাদের পরিচিত কারো যদি কোন রোগ ধরা পরে বা আমরা যখন আমাদের বাবা-মা একদিন মারা যাবে সে ধরনের চিন্তা করি, তখন এটি আগাম বিষণ্ণতা হতে পারে। এই মুহূর্তে আমরা অনেকেই চিন্তা করছি “আমার যদি করোনা রোগটি ধরা পড়ে? তখন আমার কি হবে?” ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগা আমাদের চিন্তা শক্তিতে খুব খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এসব ব্যাপার চিন্তা করে আমরা অস্থিরতায় ভুগছি কিন্তু এসব ব্যাপারে আমরা কেউ নিশ্চিত না। ফলে আমরা নিজেরা অনিরাপদ বোধ করি। বর্তমানে আমরা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি বা আমরা যে ধরনের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করছি, তার সম্পর্কে আমাদের কারো পরিষ্কার ধারণা নেই। ফলে আমাদের মধ্যে এক ধরনের অনুভুতি হচ্ছে, যা আমাদের বিষন্নতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

 

প্রশ্নঃ বিষন্নতা ব্যাপারটিতো আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। আমরা কিভাবে বিষন্নতা থেকে মুক্তি পেতে পারি?

 

বিষন্নতা নিয়ে কাজ করার প্রথম ধাপ হচ্ছে ব্যাপারটাকে বুঝার চেষ্টা করা। যেকোন সময়, যে কোন ব্যক্তি বিষন্নতায় ভুগতে পারেন, সে ব্যাপারটা মেনে নেওয়া। আমরা অনেকেই ব্যাপারটাকে নাকচ করে দেই। যেমন আমরা অনেকেই নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছি, “আমার এই রোগ হবে না”। অনেকে রেগে যাচ্ছি, “আরে তুমি আমাকে ঘরে থাকতে বলছো কেন? তুমি তো আমার দৈনিক কাজ গুলো আমাকে করতে দিচ্ছ না, যা অনেক গুরুত্ব পূর্ণ’’। অনেকে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছি, “আমি যদি বাসায় থাকি, তাহলে তো আমার ক্ষতি হবে না”। অনেকে হয়তোবা একটু দুঃখ পাচ্ছি এবং চিন্তা করছি, “ ইস! কখন যে ব্যাপারটা শেষ হবে! কখন আমি আমার স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যেতে পারবো”। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে ব্যাপারটি মেনে নেওয়া এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হওয়া। বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতে ডাক্তার ও সরকার কর্তৃক ঘোষিত বিধি নিষেধ মেনে চলা। যেমন, বাসায় থাকা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বা সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। যা আপনাকে মানসিকভাবে শান্তি দিতে পারে, হয়তোবা আপনি একটু নিরাপদ বোধ করবেন। 

 

প্রশ্নঃ এমন কোন কৌশল আছে কি যা অনুসরণ করলে আমরা তুলনামূলক ভাবে কম বিষন্নতায় ভুগবো?

 

আগাম বিষন্নতার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময়ই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করি, যেমন আমার বাবা-মা অসুস্থ হতে পারে, আমি নিজেও অসুস্থ হতে পারি, আমার ব্যবসায় ক্ষতি হতে পারে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে পারে, যদি পরীক্ষায় পাস না করি, যদি চাকরি না পায়। আপনি চাইলেও অনেক সময় এসব চিন্তা বাদ দিতে পারবেন না। আপনি যদি জোর করে এসব চিন্তা বাদ দিতে চান, তা আপনার বিষন্নতাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে আপনি কি চিন্তা করছেন তার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা। আপনি যখন অনেকগুলো খারাপ জিনিস ভবিষ্যতে হতে পারে তা চিন্তা করছেন সঙ্গে সঙ্গে আপনি এটাও চিন্তা করতে পারেন কিনা, কিছু ভালো জিনিস যা ভবিষ্যতে হতে পারে, যেমন আপনি যদি বন্ধের সময়টাতে ভালো করে পড়াশুনা করেন তাহলে হয়তোবা আপনার পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হবে, হতে পারে সেটি আপনাকে খুব ভালো একটি চাকরি পেতে সাহায্য করবে, যা আপনার সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করবে, ভালো একটা অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। আপনি আপনার পরিবারের সাথে একটু বেশি সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন। যেহেতু আগাম বিভিন্নতার ক্ষেত্রে আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তা করি, সেক্ষেত্রে একটি উপায় হতে পারে বর্তমান নিয়ে চিন্তা করা। যেমন আপনাকে যদি এখন চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে বলি যে আপনার আশেপাশে কি কি আছে সেটা হয়তোবা আপনি ভাল করে বলতে পারবেন না। কারণ আমরা অনেক সময় খুব মনোযোগ দিয়ে তা লক্ষ্য করি না। হয়তোবা আপনার সামনে একটি কম্পিউটার আছে, একটা মোবাইল ফোন, আপনার মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে, একটি পড়ার টেবিল, অনেক গুলো বই, কয়টি জিনিসের নাম বলতে পারবেন আপনি? আপনি যদি একটু চিন্তা করেন, আপনি আজকে ভালো আছেন, সকালবেলা হয়তো খুব ভালো নাস্তা করেছেন, রাতে ভাল ঘুম হয়েছে, আপনার বাবা-মা সুস্থ আছেন। বর্তমানের ছোট ছোট ভাল ব্যাপার গুলোকে যদি আপনি মনে করতে পারেন তা ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার যে দুশ্চিন্তা তা কমাতে আপনাকে সাহায্য করবে। পাশাপাশি আপনার এটিও বুঝতে হবে সবকিছু আপনার হাতে নেই। আপনি চাইলেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আপনার প্রতিবেশীরা কি করছে সেটি আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আপনি হয়তোবা তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন, অংশ হতে পারেন যেটা আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে। আপনার নিরাপত্তা জোরদার করবে এমন কাজে যোগ দিন। এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছি আমরা। একটু সহানুভূতিশীল হওয়ার চেষ্টা করুন। প্রত্যেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। একটু চিন্তা করুন আপনি কোনভাবে অন্যকে সাহায্য করতে পারেন কিনা। আপনার চিন্তা শুধু যাতে আত্মকেন্দ্রিক না হয়। 

 

প্রশ্নঃ বর্তমান পরিস্থিতি বা এই মহামারী কখন শেষ হবে তা আমরা কেউ জানিনা। ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের কিভাবে চিন্তা করা উচিত?

 

এটি সাময়িক ব্যাপার। আমি দশ বছর হাসপাতালে কাজ করেছি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী করা উচিত সেটা নিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এছাড়াও আমি ১৯১৮ সালের মহামারী নিয়ে পড়াশোনা করেছি। আমার তো মনে হচ্ছে আমরা এখন যে ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি তা যদি চালিয়ে নিতে পারি তাহলে আমরা অতি শীঘ্রই পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে পাব। ইতিহাস আমাদের তাই বলে। এখন আমাদের সবার উচিৎ মাথা ঠান্ডা রেখে বিধি নিষেধ বা নিয়মকানুনগুলো মেনে চলা।

 

আমি বিশ্বাস করি যেকোন পরিস্থিতি আমাদের নতুন কিছু শেখায়। যেমন, এখনকার পরিস্থিতি আমাদেরকে শেখাচ্ছে যে আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূরে থেকেও কিভাবে একে অপরের কাছে থাকতে পারি, আমরা বুঝতে পারছি মুক্ত বাতাসে হাঁটাহাঁটি করতে পারার ব্যাপারটা কত মূল্যবান বা একে অপরের সাথে দেখা করা, গল্প করা, যা হয়তোবা আমরা কখনোই অনুভব করিনি। আমরা হয়তোবা মনে করতাম ঘরে শুয়ে বসে থাকতে পারাটাই আনন্দ, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি ব্যাপারটা আসলে আমরা যা মনে করেছিলাম পুরোপুরি সেরকম না। যা আমাদেরকে জীবন নিয়ে, সমাজ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে।

 

প্রশ্নঃ আপনার এই অভিজ্ঞতা বা পরামর্শ গুলো শোনার পরেও যারা অনেক বিষন্নতায় ভুগছেন তাদেরকে আপনি কি বলবেন?

 

চেষ্টা করতে থাকুন। বিষন্নতা অনেক সময় আমাদের নিজেদের নতুন করে চিনতে শেখায়। গত সপ্তাহে অনেকেই আমাকে বলেছেন, “আমি আমার সহকর্মীদের বলেছি আমার খারাপ সময় যাচ্ছে” “আমি গতকাল রাতে কেঁদেছি”। আপনি যখন একবার ব্যাপারটা অন্য জনের সাথে শেয়ার করতে পারবেন, যখন ব্যাপারটাকে মেনে নিবেন, তখনই আপনি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন। আপনি যে খারাপ সময় দিয়ে যাচ্ছেন সেটা মেনে নেওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রথম প্রজন্ম যারা নিজেরা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের ব্যাপারে নিজেরা চিন্তা করছি। অনেকেরই মনে হতে পারে “আমার কিছু ভালো লাগছে না”, কিন্তু এমনটি হওয়া উচিত না। আমার চেয়ে তো অনেক মানুষ আরও বেশি কষ্টে আছে সে তুলনায় আমার কষ্ট কোন কষ্টই না” ব্যাপারগুলোকে আমাদের এভাবে চিন্তা করা উচিত নয়। যেহেতু আমরা মানুষ আমাদের খারাপ লাগতেই পারে। সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। অন্যজন কি মনে করছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। আপনাকে আপনার নিজেকে নিয়ে কাজ করতে হবে। যদি ব্যাপারটা নিয়ে কাজ করেন, তখনই এরই ধারাবাহিকতায় আপনি ভালো অনুভব করবেন।

 

প্রশ্নঃ এরই ধারাবাহিকতায় বলতে কি বুঝাতে চেয়েছেন? 

 

অনেক সময় আমরা যা অনুভব করছি তা অনুভব না করার চেষ্টা করি। আপনার যদি খারাপ লাগে তবে খারাপ লাগতে দিন। লুকিয়ে রাখলে বা স্বীকার না করলে খারাপ লাগাটা চলে যাবে না। বরং, বিষয়টিকে মেনে নিলেই আপনি ভালো বোধ করবেন। আপনি সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন। আমাদের মস্তিষ্ক এভাবেই কাজ করে। সময়ের সাথে সাথে আমাদের অনুভূতি ও চিন্তা বদলাতে থাকে। ব্যাপারটা খুব আজব! যদি আমরা মনে করি বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের খারাপ লাগা বা বিষন্নতায় ভোগা উচিত না। এমনটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক, সময়টা এমনই। চলুন বিষন্নতা বা খারাপ লাগাটাকে মেনে নিই এবং সামনে এগিয়ে যায়।  

 

Ahmed Sabbir

Deputy Manager, Marketing and Communication, BYLC

All stories by:Ahmed Sabbir
1 comment
  • সচেতন ও সময়োপযোগী এমন একটি ব্লগের জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Ahmed Sabbir

Deputy Manager, Marketing and Communication, BYLC

All stories by:Ahmed Sabbir
Seo wordpress plugin by www.seowizard.org.