Posts Tagged :

স্বপ্ন যাত্রা

আমি, স্বপ্নের পথ যাত্রী

3600 2400 Mutasim Billah

যে স্বপ্নের মধ্যে সীমানা থাকে তাকে কি স্বপ্ন বলা যাবে? সে যাত্রাকে কি স্বপ্ন যাত্রা বলা যাবে যার কিনা শেষ আছে? শেষই যদি হবে তবে তা আর স্বপ্ন কেন?

ছোট বেলা থেকেই আমাদেরকে স্বপ্ন দেখানো হয়। বড় হয়ে আমাদের অর্জন কি হবে কিংবা কি হওয়া উচিত তা নিয়ে। সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে অনেক কিছুই বলা হয়, যেটি বলা হয় না তা হল নিজেকে চেনার কথা। অথচ যে স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি তা পূরণ করতে হলে সবার প্রথম নিজেকেই যে চিনতে হবে সে উপলব্ধিটুকুই আমাদের নেই।

 আমার নিজেকে জানার যাত্রাটি শুরু হয় ২০১০ সালে যখন আমি বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশীপ সেন্টার নামে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নেতৃত্ব শেখা শিখতে আসি। ওখানে গিয়ে দেখলাম একটা রুমের মধ্যে আরো ৪২ জন শিক্ষার্থী আমার মত একই রঙের টি শার্ট গায়ে বসে আছে। তাদের সাথে বসে আমার অনুভুতি হল যে এখানে দেশ সেরা স্কুল, কলেজ এবং মাদরাসা থেকে অসাধারণ সব মানুষজন বসে আছে। তাদের সাথে টিকে থাকার লড়াইটা আমার জন্য খুব কঠিন হবে। যতই দিন যাচ্ছে আমি অবাক হয়ে দেখলাম যে সবাই কত কিছু জানে আর একেক জন জীবনের দৌড়ে আমার থেকে কত এগিয়ে।
 ঐ প্রোগ্রামেই উপলব্ধি করতে পারলাম যে আমিও পারি নিজের জীবন পরিবর্তনে অবদান রাখতে, যে অবদান হয়ত বদলে দিতে পারে আরো দশ জনের জীবন। বদলে দিতে পারে বাংলাদেশ।
 তখন থেকেই চিন্তা হতে থাকে যে, সবাই যদি নিজের ভাল চায়, অন্যের ভাল চায়, সর্বোপরি দেশের ভাল চায় তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কেন আমাদের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশের দিকে আমরা এগিয়ে যাই না?
 ধীরে ধীরে জেনে গেলাম, যে বাংলাদেশ কে নিয়ে স্বপ্ন আমাদের এক হলেও সেই সেই স্বপ্নকে আমরা শিক্ষা মাধ্যমের নামে তিনটি ভাগে ভাগ করে রেখেছি। যে মাধ্যমে থেকে আমরা একে অপরের ব্যপারে না জেনে হয়ত লালন করছি অনেক ভুল ধারনা। যার ফলশ্রুতিতে হয়ত তাদের মূল্যবোধকে সম্মান জানাতে পারছি না। বুঝতে পারছি না তাদের অবদানকে যা তারা দেশের জন্য করে যাচ্ছে।

আমাদের অভিযোগের কোন শেষ নেই। নানা রকম সমস্যায় জর্জরিত আমরা। কিন্তু কখনো হয়ত অনুভবই করি না যে আমাদের সমস্যার জন্য অনেকাংশে আমি নিজেরাই দায়ী। সেখানে তা সমাধানের জন্য আরেকজনের দিকে তাকিয়ে থাকলে এগিয়ে যাবো না কখনই। সমস্যার জন্য দায়ী করে আমরা সবসময় বলি আমাদের দেশে সঠিক নেতৃত্ব নেই। নেতৃত্ব নিয়ে যখনই কথা হয় আমরা কিছু সুমহান গুনাবলির কথা বলি। কিন্তু বলি না যে আমাদের জায়গা থেকে আমরা কি করতে পারতাম। না বলার কারনটা, হয়তো আমাদের মাঝে সে বিশ্বাসই নেই যে আমরাও পারি।

 সেই অনুভুতি থেকেই আমার পথ চলা শুরু। এরপর থেকে যতবার থেমে গিয়েছি, বারবার নিজেকে শুনিয়েছি ‘আমি পারি’। বিওয়াইএলসির ঐ প্রোগ্রামেই আমি শিখেছিলাম কিভাবে মানুষের সামনে দাড়িয়ে কথা বলতে হয়। কিভাবে নিজের বক্তব্যটি কার্যকর ভাবে তুলে ধরা যায় মানুষের সামনে। এরপর থেকে যখনই সুযোগ পেয়েছি কথা বলেছি মানুষের সামনে। চর্চা করেছি, নিজের কথা বলার দক্ষতা কে বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। দীর্ঘ ৪ মাস পর যখন ঐ প্রশিক্ষণ শেষ হল তখন মনে হল এবার আমার পালা। যা শিখেছি তা কাজে লাগাতে হবে। আমিও এবার মানুষকে স্বপ্ন দেখাব। যারা আমার মতই আটকে আছে নিজের জীবনের গন্ডিতে তাদেরকে দেখাব কিভাবে তারাও পারে তাদের স্বপ্নকে সীমাহীন দিগন্তে ছড়িয়ে দিতে।
 এর পাশাপাশি একটা চিন্তা ছিল। আমি যে সুযোগ পেয়েছি তা সবাই পায় না, আর অনেকেই পেয়ে কাজে লাগায় না। ঐ সময়টাতে যারা সুযোগ পায় না তাদের জন্য খুব বেশি কিছু করার না থাকলেও সুযোগ ছিল যারা সুযোগ পায় তারা যেন তা কাজে লাগাতে পারে তাতে সাহায্য করা। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই শুরু করলাম নেতৃত্ব পড়ানো। বাংলাদেশের ভিন্ন আর্থ সামাজিক অবস্থান থেকে উঠে আসা তরুণপ্রাণদের সাথে কাজ করার মাধ্যমে দেশের সার্বিক অবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি নিজের ও অন্যদের মাঝে নেতৃত্বের গুনাবলি ছড়িয়ে দেয়াই উদ্দেশ্য। শুরু করলাম বিওয়াইএলসি’রই ১ মাসের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম দিয়ে।
সেই প্রোগ্রামে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়, পরিচয় হয় অনেকগুলো সুন্দর মানুষের সাথে। যাদের সাথে এখনো আমার যোগাযোগ আছে, যাদের কাছ থেকে এখনো অনেক কিছুই শিখি। সেখানে কারো জীবনে কোন সামান্য অবদান রেখেও যে তাদের জীবন বদলে দেয়া যায় সেটা নিজের চোখেই দেখতে পেয়েছিলাম। ২০১২ সালে ওই প্রোগ্রামের শেষে বিওয়াইএলসি’র সকল গ্র্যাজুয়েটদের নিয়ে গঠিত এলামনাই বিওয়াইএলসি গ্র্যাজুয়েট নেটওয়ার্ক – বিজিএন’র পরিচালনা কমিটির নির্বাচন। মাদরাসা মাধ্যম থেকে নিজে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচনে দাঁড়ালাম। সেদিন হেরে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওই নির্বাচনটা আমাকে অনেক চিন্তার খোঁড়াক দিল। আসলেই যদি ভাল কিছু করতে চাই তবে কি একটি পদ খুব বেশি দরকার? নির্বাচনে জিততে পারি নি, তবে কি আমাকে দিয়ে হবে না?

বুঝতে পেরেছিলাম যে, যদি তীব্র ইচ্ছা থাকে তবে ঐ সব ছাড়াও এগিয়ে যাওয়া যায়, অন্যদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও যায়। তখন থেকেই চেষ্টা করেছি নিজেকে গড়ে তোলার। ২০১৪ সালে যখন আবার বিজিএন এর নির্বাচন হয় তখন আমি প্রতিনিধিত্ব করি বিজিএন প্রেসিডেন্ট এর পদটির জন্য। জানি না কোথা থেকে পেয়েছিলাম ঐ সাহস, তবে ঠিকই দায়িত্ব পেয়েছিলাম দেশ সেরা প্রায় ২৫০০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে গঠিত বিজিএন’র প্রধান হিসেবে কাজ করার। নিজেকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তা পূরণ হল। তবে যুদ্ধ মাত্র শুরু। এত বড় দায়িত্ব পালনের কোন যোগ্যতা তখনও আমার হয়ে উঠে নি। নিজেকে গড়ে তোলার আসল কাজটা এবার যে করতেই হবে। যে কাজটা আজ অবধি করে যাচ্ছি। কাউকে কিছু প্রমাণ করতে চাইনি কোনদিন শুধুমাত্র নিজেকে প্রমাণ দিতে চেয়েছি যে ‘আমি পারি’। আমি জানি আমি কোন জায়গা থেকে নিজেকে কোথায় নিয়ে এসেছি এবং কোথায় নিয়ে যেতে চাই।

 প্রতিদিন নিজের জন্য নতুন নতুন লক্ষ্য ঠিক করেছি। কারো সাথে প্রতিযোগিতা ছিল না, যা ছিল তা নিজের সাথেই। আমাকে যারা জীবনে বড় হতে শিখিয়েছেন আমি সব সময় তাদের মত হতে চেয়েছি। হতে চেয়েছি নিঃস্বার্থ, হতে চেয়েছি এমন একজন মানুষ যাকে যে কেউ তার উপকারে খুঁজে পায়। একটি একটি করে ধাপ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।
এই পথ চলার মধ্যেও আমাকে পিছন থেকে টেনে ধরার মত অনেক কিছুই ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে হেরে যাওয়া, মানুষের অনুৎসাহিত করার মত কথা। অনেক কিছু। ২০১৫ সালে আমি দ্বিতীয়বারের মত নির্বাচন করেছিলাম বিজিএন’র সভাপতি পদের জন্য। আগের ১ বছর নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করেছিলাম প্রতিষ্ঠানটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, চেষ্টা ছিল একে যেন হাজারো তরুণের স্বপ্ন পূরণের প্লাটফর্ম হিসেবে তৈরি করতে পারি। কিন্তু নির্বাচনে আমি হেরে গিয়েছিলাম। বিশাল ব্যবধানে। তখন যতটা না কষ্ট পেয়েছিলাম তার চেয়ে বেশি শিক্ষা, উপলব্ধি হয়েছিল। আমি অনেকটাই নিশ্চিত ছিলাম আমি জিতে যাবো। এখন আমি বুঝি, ঐ ঘটনাটার কারণে আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমাকে অনেক শিখতে হবে।
 এরপর জীবনে আরো বেশ কিছু সুযোগ আমি পেয়েছি, পেয়েছি অনেক সম্মান। কিন্তু কখনো নিজের অতীত ভুলে যাই নি, নিজের শেখার আগ্রহকে দমে যেতে দেই নি কখনো। মনে হয়নি আমার জীবনের লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেছে। কারন আমি জানি আমার স্বপ্নের কোন সীমানা নেই। আমাকে যেতে হবে অনেক দূর।
 অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমার অর্জন কি? আমি কখনো তাদের উত্তর দেই না। হাসি। কারন আমি জানি এবং বিশ্বাস করি যে আমার কাজই তাদের সে প্রশ্নের উত্তর। তবে যখন নিজের অজান্তে নিজের মনে এমন প্রশ্নের উদ্ভব হয় তখন নিজেকে বলি, কেউ যখন বলে আমার জন্য তার জীবনে সে স্বপ্ন দেখতে শিখেছে সেটি কি অর্জন নয়? যখন শত মানুষের সামনে দাড়িয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছে এবং সে কথায় কারো জীবন পরিবর্তন হয়েছে, তা কি সফলতা নয়?
 আমি এখনো কাজ করে যাচ্ছি, স্বপ্নের কাজ। পরিবর্তনের পথে হেঁটে চলছি আমি, স্বপ্নের পথ যাত্রী।
Seo wordpress plugin by www.seowizard.org.