Monthly Archives :

December 2018

ভালো থাকুন!

1920 1280 মুতাসিম বিল্লাহ

আপনার প্রিয় কোন জিনিষ যদি আপনার অজান্তেই হারিয়ে যায় কেমন লাগে আপনার? হারিয়ে যাওয়া যদি বেশি হয়ে যায় তাহলে একবার চিন্তা করে দেখুন প্রিয় সেই জিনিষটি যদি ভালো না থাকে তবেই বয়া কেমন লাগে আপনার?

আচ্ছা মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় কিছু কি আমাদের আছে? সম্পর্কের সীমারেখা যদি মুছেও ফেলি তবুও এই মানুষের অস্তিত্ব ছাড়া আর কিইবা আছে আমাদের?

গত কয়েক বছর ধরেই হতাশা এবং তার জের ধরে আত্মহত্যা আমাদের তরুণদের জন্য এক বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েকদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় জীবনের কাছে আত্মসমর্পণ করা অনেকগুলো খবর আমাদের কপালে চিন্তার ভাজ ফেলেছে।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি বেশ কিছু আত্মহত্যার কথা জানি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হয়েছি কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের আফরা আনিকা মৈত্রীর আত্মহত্যার খবরে। মৈত্রী আমার খুবই পছন্দের, কাছের ছোট বোন। বিওয়াইএলসিতেই পড়ানোর সুবাদে ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল, পরে একসাথে কাজও করেছিলাম। এই ঘটনার কিছু আগে পরেই আমার পরিচিত আরেকজনের ছোটভাই কে সকালে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। এই ঘটনা দুটি আমার ভিতর থেকে এমন ভাবেই নাড়া দিয়েছিল আমি অনেকটা সময় বাকরুদ্ধ অবস্থায় ছিলাম। অনেক হিসাব মিলছিল না।

আচ্ছা মানুষ আত্মহত্যা কেন করে? শুধু কি মানসিক ভাবে দুর্বল মানুষজনই আত্মহত্যা করে? কিভাবে এই প্রাণগুলোকে বাঁচানো জায়? এই প্রশ্নগুলো আমাকে অনেক রাত ঘুমাতে দেয়নি। আমার আসে পাশের মানুষ মাত্রই কিছুটা জানে আমি কখনোই এই মরে যেতে ইচ্ছা হয়, মাঝে মধ্যে ভাবি মরে যাবো ধরণের কথা শুনতে কতটা বিব্রত বোধ করি।

মানুষের আত্মহত্যার অনেক ধরণের কারণ থাকতে পারে। সে কারণগুলো কে মোটা দাগে ২টি ভাগে ভাগ করা যায়।

১। কারো কাছ থেকে অবহেলা পাওয়া ও অনুসুচনায় ভোগা

২। নিজের অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাওয়া

অনেকটা কাছাকাছি হলেও আত্মহত্যার সবগুলো ঘটনাকে এই দুই ভাগে মোটামোটি ফেলা যায়। এই দুটি গণ্ডীর মধ্যে থেকেই আত্মহত্যার ব্যাপারে চিন্তা করা মানুষ ও আমাদের করনীয় কিছু বলার প্রয়াস করছি।

অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনাগুলো দেখলে জানা যায় যে আত্মহত্যাকারী মানুষটি তার কাছের কোন মানুষ থেকে বেশ ভালো ধরণের অবহেলার শিকার। এ ক্ষেত্রে হতে পারে তাদের চাওয়া পাওয়ার মিল হয় নি। অথবা এমনও অনেক সময় হয় কেউ কাউকে নিদারুণ কষ্ট দিয়ে ফেলেছে, অপরাধবোধ থেকে অনেকেই আত্মহত্যার পথে পা বাড়ায়। যে কষ্ট পাওয়া বা অপরাধ বোধ হয়ত সামান্য কিছু আলোচনার মাধ্যমেই মীমাংসা করা যেত।

হতাশ মানুষের সাথে কথা বলার অভিজ্ঞতা আমার দীর্ঘদিনের। সব ক্ষেত্রেই যে কথাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি শুনতে হয় তা হল, আপনার কি মনে হয় আমি ইচ্ছা করে এমন করছি কিংবা আপনার বেলায় হলে বুঝতেন কি কষ্ট এমন অনুভূতির জায়গায়। তাদের আমি যেটা সব সময়ই বলি তা হল কেউ কখনোই সজ্ঞানে নিজেকে কষ্ট দেয় না। উল্টা মানুষ যখন যুক্তি থেকে আবেগের দিকে অনেক বেশি ভারি হয়ে যায় তখন আসলে মানুষ সজ্ঞানে থাকেই না। তাই নিজেকে কষ্ট দেয়। এবং দ্বিতীয় কথাটির সাথে মিল রেখে যেটা বলি তা হল আমি ঐ জায়গা তে নেই দেখেই আমি আসলে বের হওয়ার পথটা দেখতে পাচ্ছি। যেমন কেউ যদি একটা গোলক ধাঁধার মধ্যে থাকে সে তখন সেখান থেকে বের হতে পারে না, কারণ সে সামনের রাস্তাটা দেখতে পায় না। কিন্তু বাইরে যারা থাকে তারা একটু উপর থেকে দেখতে পারে বলেই তারা জানে যে বের হওয়ার রাস্তা আসলে কোনদিকে। এতে যে ধাঁধায় হারিয়ে গেছে তাকে অবহেলার করার অথবা বাইরে দাঁড়িয়ে পথ বলে দেয়া লোকটাকে অবজ্ঞা করার কিছু নেই।

মনে রাখা দরকার যে কেউ যদি আত্মহত্যার কোন কারণ হিসেবে যুক্তি দেখায় তখন তাকে আবেগ দিয়ে বুঝাতে হয় অপরদিকে যদি কারণ হিসেবে আবেগ দেখায় তাহলে তাকে যুক্তি দেখাতে হয়। এটাই এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার এক মাত্র উপায়। তাতে মাঝে মাঝে অন্যকে নির্দয় কিংবা উপদেশ দেয়া সহজ ধরণের মানুষ মনে হতে পারে, কিন্তু উপায় এটাই।

এবার আপনারা যারা আপনাদের হতাশা থেকে বের হওয়ার জন্য সম্ভাব্য উপায় হিসেবে আত্মহত্যাকে দেখতে পাচ্ছেন তারা একটু মন দিয়ে পড়তে পারেন।

এমন যদি হয় আপনি অপরাধবোধে ভুগছেন, কিংবা কেউ আপনাকে অবহেলা কষ্ট দিয়েছে তাহলে আপনার জন্য একটা সহজ উপায় আছে যা অন্তত মরে যাওয়া থেকে সব দিক থেকেই উত্তম।

Adaptive Leadershipর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে কনভারসেশন বা আলোচনা করা। এই আলোচনা করাকে আমরা ৪টি ভাগে ভাগ করতে পারি, তার মধ্যে একটি হল Courageous Conversation. এ ধরণের আলোচনাকে Courageous বলা হয় কারণ এই ধরণের আলোচনার জন্য অনেক সাহস প্রয়োজন হয়। দরকার পড়ে নিজের আমিত্বকে একটু ছেড়ে দেয়ার। কিন্তু এটা অনেকটাই জাদুকরী একটা ব্যপার। এ ধরণের আলোচনা অনেক ধরণের সমস্যা সমাধান করে দিতে পারে দেখেই হয়ত আমাদের সমাজে এ ধরণের আলোচনার সংখ্যা খুব কম।

এ ধরণের আলোচনার জন্য দুই পক্ষকেই এক সাথে দাঁড়াতে হয়। যেখানে আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করার পাশাপাশি আমাদের অবস্থানের কারণে আরেকজনের যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা মেনে নেই। ব্যাস, এটুকুই। এখানে আমরা ওপর পক্ষ কে বলতে শিখি যে দেখে আমি জানি আমি যা করছি তাতে তোমার এই ক্ষতি টা হচ্ছে কিন্তু আসলে আমি কাজ টা করছি এই কারণে, এখানে যে লাভটা আছে টা হল এই। এতে যা হয় তা হল ওপরপক্ষের প্রতি এক ধরণের সহমর্মিতা প্রকাশ পায়। পৃথিবীতে আপনি এগিয়ে যেতে চাইলে আপনাকে অনেক সময়ই আরেকজনকে পিছনে ফেলে আসতে হবে। খুব কম সুযোগই আপনি পাবেন যেখানে সবাই এক সাথেই এগিয়ে যাওয়া যায়। তো অন্যের এই ক্ষতিটুকু স্বীকার করতে সমস্যাটা কোথায়? অনেক সময় আপনার হয়ত কিছু করার নেই, তাহলে দোষ কোথায় এটা মেনে নিতে, বলতে যে আপনি সহমর্মি এই ক্ষতির জন্য।

যার সাথে অন্যায় করেছেন, যাকে কষ্ট দিয়েছেন তার সাথে একবার বসুন, বলুন কেন আপনি বাধ্য কিংবা অনেক সময় সাময়িক ক্ষতি উপেক্ষা করলে যে সুন্দর ভবিষ্য পাওয়া যায়। এ ধরণের আলোচনা মূলত হয় হৃদয়ের সাথে। যেখানে দুই পক্ষই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন আলোচনায় জেতার জন্য নয় বরং আলোচনায় সফল হতে যেন ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়। চেষ্টা করে দেখুন নিজে এধরনের আলোচনা করতে এবং অপরদিকে কেউ যদি আপনার সাথে কথা বলতে চায় তাকেও একটু সুযোগ করে দিন। নিজের মনের ভেতর থেকেই অনেক সাহস পাবেন, হালকা লাগবে। কষ্ট কতটা কমবে আমার জানা নেই তবে আর মরে যেতে ইচ্ছা করবে না এতটুকু নিশ্চিন্তেই বলা যায়।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে নিজের অস্তিত্বের সংকটে ভুগতে থাকা কে দায়ী করা যায়। সত্যি বলতে আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা এ সংকট তৈরিতে বেশ তপর। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে অন্য মানুষের কথিত সাফল্য অপরদিকে নিজের আকাঙ্ক্ষিত পর্যায় পৌঁছাতে না পারা এই সংকটের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করা, চাকরীর বাজারে গুণের চেয়ে রূপের, অনেক সময় প্রতিভার চেয়ে ফলাফলের কদর বেশি হওয়া এই সংকটের আগুনে জ্বালানির মত কাজ করে। সহজ ভাষায় নিজের সঠিক মূল্যায়ন না হলেই আমরা ভাবতে থাকি আমাদের সব শেষ।

মানুষের জীবন অনেকটা পর্দায় অভিনয় করা একজন শিল্পীর মত। একজন শিল্পী যেমন তার জীবনে অনেক ধরণের চরিত্রে অভিনয় করে বাস্তবেও কিন্তু তাই হয়। কিন্তু যত ভালো শিল্পীই হোক না কেন কেউ কিন্তু সবগুলো চরিত্রে একদম শতভাগ সেরা অভিনয় করতে পারে না। আমাদের পছন্দের নায়ক নায়িকাদের দিকে তাকালেই কিন্তু এর খুব ভালো উদাহরণ পাওয়া যায়। একজন নেতিবাচক চরিত্রের অভিনেতা যদি ভালবাসায় পরিপূর্ণ একজন প্রেমিকের ভূমিকায় অভিনয় করে তখন সেটি তার জন্য ঝুঁকির বিষয়, এবং সে যদি সেই ভূমিকাটি যথার্থভাবে চিত্রায়ন করতে না পারে তা কিন্তু তাকে তার নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করার জন্য অযোগ্য করে তুলে না।

এই যদি হয় অবস্থা তবে কেন সাধারণ জীবনে হাজারো চরিত্রে অভিনয় করা আমরা আমাদের কোন একটি ভূমিকা ঠিক ভাবে চিত্রায়ন না হলেই জীবন শেষ ভেবে বসে থাকি? ছাত্র হিসেবে আপনি বাজে হতে পারেন, তবে তা কেন একজন দায়িত্ববান সন্তান হিসেবে আপনাকে অযোগ্য করে তুলবে? একজন অসফল প্রেমিক অথবা একজন স্থূলকায় কর্মচারী হিসেবে কেন আপনি একজন আদর্শ বোন কিংবা সাহায্যকারী বন্ধু হতে পারেন না?

জীবনে কোন মানুষই নিজের সর্ব ক্ষেত্রে সমান সফল হতে পারে না, আবার একবার অথবা হাজার বার ব্যর্থ হওয়াটাও তেমনি ভাবে কোন সফল হতে না পারার প্রমাণ হতে পারে না। চেষ্টা এবং আগ্রহ আপনাকে যেকোনো পর্যায় থেকেই আপনার কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। সব মানুষের জন্য সফলতার মাপকাঠি সমান নয়। এর কোন জাগতিক নিয়ম নেই। আপনার কাছে সম্পদ হতে পারে সফলতা আরেকজনের কাছে খ্যাতি, আবার অন্যজনের কাছে ভালবাসা। যদি তাই হয় তবে তুলনা করারই বা প্রয়োজন কি?

যখনই কোন বিষয়ে নিজের অস্তিত্বের সংকটে ভুগতে থাকবেন, চেষ্টা করুন আপনি কোন দিক থেকে ভালো সেই দিক গুলো খুঁজে বের করতে, যদি না পান তাহলে দেখুন কোন বিষয় ভালো করাটা আপনার জন্য সহজ। নিজেকে বলতে শিখুন যে পৃথিবীর সব কিছু আপনাকে পারতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আপনি আপনার মত। আপনি যা পারেন তা চেষ্টা করেন এমন ভাবে করতে যে এর চেয়ে ভালভাবে আর সম্ভবই না। প্রতিযোগিতাটা রাখার চেষ্টা করুন নিজের সাথে। এতে জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস সবই বাড়বে।

সর্বোপরি, আপনার আসে পাশের মানুষজনকে ভালো রাখার চেষ্টা করুন, দেখবেন তারাও আপনাকে ভালো রাখার চেষ্টা করবে। নিজেকে, নিজের পরিবার প্রিয়জনকে সময় দিন, যারা আপনাকে মূল্যায়ন করে না, তাচ্ছিল্য করে তাদের থেকে কিছুটা দূরত্বও রাখতে পারেন।

মনে রাখবেন, ভালো রাখার জন্য ভালো থাকা প্রয়োজন।

Seo wordpress plugin by www.seowizard.org.