ডিপ্রেশন; নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচান

ডিপ্রেশন; নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচান

1000 611 Jamia Rahman Khan Tisa

ডিপ্রেশন আর স্যাডনেস এক নয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO)-র মতে পৃথিবীতে প্রায় ৩০০ মিলিয়নেরও বেশী মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগে। এই ডিপ্রেশন ক্যান্সার বা হৃদরোগের মতই একটি রোগের নাম। কিন্তু একে আমরা রোগ বলে স্বীকার করতে নারাজ। ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা বলতে খুব সহজেই আমরা যা বুঝি তা হলো মন খারাপ থাকা বা দুঃখে থাকা। কিন্তু আসলেই কি বিষণ্ণতা মানে শুধুই মন খারাপ? শুধুই দুঃখে থাকা?

প্রিয় কোন মানুষকে হারালে, পরীক্ষায় খারাপ করলে, অসুখ হলে কিংবা যে কোনো আঘাতে আমাদের মন খারাপ হয়। আবার সময়ের সাথে তা কেটেও যায়। একে কি বিষণ্ণতা বলা যাবে? কিংবা সময়ের সাথে দুঃখ কেটে গেলেই কি বিষণ্নতা কেটে যায়?
আমাদের বোধহয় প্রচলিত ধারণা ভেঙ্গে একটু জানা উচিত, ভাবা উচিত নতুন করে। কারণ ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা শুধুই সাময়িক দুঃখ বা মনখারাপ নয়। বরং এটি একটি বোধ যা আমাদের করুণ পরিণতি ডেকে আনে, নিঃশেষ করে দেয় তিলে তিলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অবসন্ন মন(লো মুড), শক্তিহীনতা(লো এনার্জী) এবং উৎসাহহীনতা (লো ইন্টারেস্ট) কে ডিপ্রেশন বলা হয়েছে। মোটকথা ডিপ্রেশন এমন একটা অবস্থা যখন আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা,  জীবন ও ভবিষ্যত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি এবং একসময় এই ধারণা আমাদের মাঝে বদ্ধমূল হয়ে যায়।

কমবেশি সবার জীবনেই আঘাত আসে। আমরা সে আঘাত কাটিয়েও উঠি। কিন্তু কিছু আঘাত আমাদের এত বেশি কষ্ট দেয় যে সেটা আমরা ভুলতে পারিনা। একধরণের শূণ্যতা আমাদের গ্রাস করে। একসময় শূণ্যতাবোধ এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করে যে নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ নিরর্থক মনে হয়। স্বাভাবিক জীবনযাপন আর মানুষটি করতে পারেনা। একসময় এই নিরর্থক জীবনের মুক্তি হিসেবে মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কিছুটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে অনেকসময় কোনো কারণ ছাড়াই এই ডিপ্রেশনের সৃষ্টি হয়। বৈজ্ঞানিক ভাবে ব্যক্তিগত জীবনের নানাবিধ ঘটনা, কোনো অসুখ, ব্রেইনের ক্যামিকেল ইমব্যালেন্স, বংশগতি ইত্যাদি কারণগুলোকে ডিপ্রেশনের জন্য দায়ী করা হয়। আসলে এর কারণ  জানাটা খুব কঠিন। কারণ কার মানসিক গঠন কোন ঘটনায় কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটা ব্যক্তিভেদে আলাদা।

আমাদের করণীয়

একজন মানুষ যখন আত্মহত্যা করে তখন তাকে আমরা নানাভাবে বিচার করা শুরু করে দেই। সবচেয়ে কমন কথাটা হলো তাকে ভীতু বলি। আমরা বলি তার দুঃখকে মোকাবেলার ক্ষমতা নেই। কিন্তু আদৌ কি ভাবি ঠিক কতটা অসহায় নিজেকে মনে করলে মানুষ এ ধরণের সিদ্ধান্ত বেছে নেয়?

আবার, অনেকে ডিপ্রেশনকে বিলাসিতা বা শৌখিনতা মনে করেন। আমরা হুট করে বলেই দেই যে “আরে, কোনো কাজকর্ম নাই তো। তাই ই ডিপ্রেশড থাকার সময় পায়”। আদৌ কি এটা ঠিক? কারো ক্যান্সার বা লিভার সিরোসিস এর মত রোগ হলে কি আমরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করি? করিনা। তবে কেনো ডিপ্রেশনে ভোগা একজন মানুষকে বিদ্রুপ করি আমরা? কেনো তার সমস্যা কে গুরুত্ব দেইনা? এই ভাবনার জায়গাতেই পরিবর্তন প্রয়োজন। ডিপ্রেশন হোক নিজের বা আশেপাশের কারো তাতে নজর দিতে হবে।

ডিপ্রেশন কর্মব্যস্ত, বেকার, ধনী, গরীব নির্বিশেষে সবার মাঝে হতে পারে। তবে গবেষণা বলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মাঝে ডিপ্রেশনের হার তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশন থাকলে  মস্তিস্কের বড়ো কোনো অসুখও হতে পারে। তবে আশার কথা হলো ডিপ্রেশনের চিকিৎসা রয়েছে। নিজে বা অন্য কেউ এ সমস্যায় আক্রান্ত হলে মানসিক দৃঢ়তা আনতে হবে, প্রয়োজনে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে উপযুক্ত চিকিৎসায় রোগী প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই ভালো হয়ে যেতে পারে। অথচ এই রোগটির চিকিৎসা প্রয়োজন বলেই আমরা মনে করিনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রায় ২৫%-এরও কম মানুষ ডিপ্রেশনের উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করে।

ডিপ্রেশন কাটাতে চাইলে সবার আগে দরকার সদিচ্ছা। আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে যে আপনার এই পরিস্হিতি আপনার জীবন এবং আপনার সাথে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের জন্য ক্ষতিকর। এই অবস্হার পরিবর্তন প্রয়োজন। আপনি যদি পরিবর্তন চান তবে সেই পরিবর্তনের জন্য কাজ করুন।

ডিপ্রেশন কাটানোর প্রথম কথা হলো আপনার এই অনুভূতির কথা বিশ্বস্ত কারো কাছে বলুন। এতে করে মন অনেকটাই হালকা হয়। এছাড়াও ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে অনেক কাজে দেয় এমন কিছু বিষয় হলো সুষম ডায়েট, শরীর চর্চা, ভ্রমণ, নতুন কোন ভাষা শেখা, পর্যাপ্ত ঘুম,  সমাজসেবা মূলক কাজ ইত্যাদি। নিজেকে ভালোবাসতে শিখুন, নিজের কাজকে ভালোবাসতে শিখুন। অপরের প্রতি প্রত্যাশা দিন কমিয়ে। রুটিনে পরিবর্তন আনতে পারেন। মাঝে মাঝে একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেতে কোথাও ঘুরে আসতে পারেন একা বা দলবেঁধে। ভ্রমণ মানুষের অবসাদ দূর করে অনেকটাই আর দেয় বাঁচার প্রেরণা।

আর হ্যাঁ। অবশ্যই জরুরি অবস্থায় ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। সঠিক পরামর্শ  আর ঔষধ আপনাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সাহায্য করবে। ডিপ্রেশন হোক নিজের বা অন্যের এগিয়ে আসুন। আপনার আশেপাশের কেউ ডিপ্রেশনে ভুগলে তাকে সাপোর্ট দিন, তার অনুভূতিকে সম্মান করুন, সাহায্য করুন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে।

ফিচার ইমেজ সোর্সঃ betterhelp

Seo wordpress plugin by www.seowizard.org.