একজন বাসন্তী দিদি এবং আমার শৈশব

একজন বাসন্তী দিদি এবং আমার শৈশব

600 423 Jamia Rahman Khan Tisa

মানুষ গড়ার কারিগর কথাটা শুনলে সবার আগে যার মুখটা আমাদের চোখে ভাসে তিনি হলেন শিক্ষক। মা বাবার পরে প্রতিটা মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশী অবদান রাখা মানুষদের তালিকায় প্রথমেই চলে আসে শিক্ষকের নাম। আমাদের জানার, বুঝতে শেখার সহযাত্রী হিসেবে তাদেরকে আমরা পাশে পাই সবসময়ই। তাদের অনুপ্রেরণায় আমরা স্বপ্ন দেখি, নিজেকে গড়ে তুলি।

‘বাসন্তী রাণী দাস’জীবনে মায়ের পরে যে নারীর অবদান আমি কখনোই অস্বীকার করতে পারবোনা আমার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি এই মানুষটির হাত ধরে। তাঁর হাত ধরেই স্বপ্ন দেখার শুরু। আমি ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত একটি এনজিও পরিচালিত উপআনুষ্ঠানিক স্কুলে পড়েছি। আমরা ৩৩ জন শিক্ষার্থী ছিলাম আর আমাদের শিক্ষক একজন। এই একজন শিক্ষকই আমাদের সবগুলো বিষয় পড়াতেন। আমাদের ৪ বছরে শেষ করতে হয়েছিলো ৫ বছরের সিলেবাস। দিদি এতো সুন্দর করে আমাদের পড়াতেন যে আমাদের পড়তে যেয়ে এতটুকুও বেগ পেতে হয়নি। ইংরেজি, বিজ্ঞান, গণিত সব বিষয়ে তার ছিল সমান দখল। জন্মসূত্রে সনাতন ধর্মাবলম্বী হয়েও আমাদের ইসলাম ধর্ম বুঝিয়ে দিতেন খুব সহজভাবে

তাঁর স্নেহের ভাণ্ডার ছিল অফুরন্তলাল পাড়ের সাদা শাড়ী, দীর্ঘ সিঁথির রক্তিম সিঁদুর, হাতে শাখাতাকেই দেবী মনে হতো আমারএকটা অদ্ভুত রকমের অনুভুতি কাজ করতোএই অনুভুতির নাম আমি আজও আবিস্কার করতে পারিনিএই স্নেহময়ী নারী কত যত্ন নিয়েই না পড়াতেন আমাদেরআমরা কখনোই স্কুল কামাই দিতাম নাআমাদের কাছে স্কুলের আরেকনাম ছিলো আনন্দ

দিদির একটা কথা আমার খুব মনে পড়ে এবং আজীবন মনে থাকবে। তিনি সবসময় বলতেন, ‘সফল নয় বরং সার্থক হয়ো’। এক অজপাড়া গায়ের স্বল্পশিক্ষিতা এক প্রাইমারি স্কুলশিক্ষিকা। অথচ কি সহজ আর গভীর তাঁর দর্শন। দিদিকে আমরা যতটা না ভয় পেতাম ভালবাসতাম তার চেয়ে শতগুণ বেশী। আমাদের স্কুলে নাচ, গান, ছবি আঁকা এসব বাধ্যতামূলক ছিলো। দিদির সবকিছুতেই দারুণ দখল ছিলো। মাঝে মাঝে অবাক হই তাঁর কথা মনে করে। ঠিক কতটা ধৈর্য থাকলে মানুষ দিনের পর দিন একসাথে ৩৩ টা ছেলেমেয়েকে সবগুলো বিষয় পড়াতে পারে! তাঁর কোন ছুটি ছিলোনা। তিনি যে একাই আমাদের শিক্ষক।  

তাঁর পরম স্নেহের ছায়ায় আমরা ক্রমাগত বেড়ে উঠছিলাম। তারপর কেমন করে সেইসব দিন ফুরিয়ে গেলো। আমরা যার যার মত বড় হয়ে গেলাম। সরে গেলাম তার ছায়া থেকে। কিন্তু ছোট্টবেলার সেই ছায়া কি আদৌ মন থেকে সরেছে? মোটেও না। স্নেহের ছায়া বুঝি কাটে কখনো? দিদির প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আজীবনের। আজ শিক্ষক দিবসে প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে লিখতে যেয়ে কেবলই মনে হচ্ছে আবার যদি সেই স্কুলে ফিরে যেতে পারতাম। আমার সমস্ত শৈশব জুড়ে মিশে আছেন বাসন্তী দিদি। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গেলেই তাঁর অফুরন্ত স্নেহের  ঘ্রাণ টের পাই।  ভালো থাকুন বাসন্তী দিদি, ভালো থাকুন পৃথিবীর সব শিক্ষকেরা। তাঁদের মঙ্গলবার্তায় ডানা মেলুক প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন।

Seo wordpress plugin by www.seowizard.org.