স্বপ্ন দেখি দিন বদলের

স্বপ্ন দেখি দিন বদলের

5364 3576 Jamia Rahman Khan (Tisa)

“ট্রাফিক জ্যাম, পরিবেশদূষণ, অপরিছন্ন ঢাকা, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, বেকারত্ব,  শিক্ষ্যাব্যবস্হায় গলদ, দুর্নীতি, ঘুষসহ আরো হাজারটা সমস্যা আমাদের চারপাশে আছে। সমস্যাগুলোর জন্য দায়ী কে? অবশ্যই সরকার। এটাই আমরা মনে করি। কিন্তু কোনোদিনও কি ভেবে দেখেছি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই হোকনা কেনো এই সমস্যা সৃষ্টির পেছনে আমারও দায় রয়েছে।  আমি চাইলে এই সমস্যার সমাধানে একটা ভূমিকা রাখতেই পারি। হোকনা সেটা খুব ছোট কিছু। হোকনা সামান্য,  তবুও তো সেটা পরিবর্তন।” বিবিএলটি থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা আমার এটাই।

২০১৫ এর সেপ্টেম্বরে আমি বিল্ডিং ব্রিজেস থ্রু লিডারশীপ ট্রেইনিং( বিবিএলটি) কোর্সটি করি। আমি এর ১৩ তম ব্যাচের একজন প্রশিক্ষণার্থী ছিলাম। আমরা মোট ৪২ জন প্রশিক্ষণার্থী ছিলাম কোর্সটিতে। বাংলা মিডিয়াম, ইংলিশ মিডিয়াম এবং মাদ্রাসা মিডিয়াম থেকে প্রায় সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী ছিলাম সেখানে। আমি যে বিষয়গুলো নিয়ে খুব স্মৃতিচারণ করি তার মধ্যে একটি হলো আমার বিবিএলটি অভিজ্ঞতা। সবাইকে বলি। অনেক সমস্যা র বেলায় বিবিএলটি ক্লাসে ফিরে যাই। ক্লাসের শেখানো বিষয়গুলোকে বাস্তবজীবনের সাথে মিলিয়ে সমাধানের চেষ্টা করি।  এমনকি  আমার ব্যক্তিগত সমস্যাতেও।

“তোমার কি মনে হয়?” বিবিএলটিতেই প্রথম কোন প্রশ্ন করার পর আমার দিকে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়েছিলো। আমরা সবসময় সমস্যার সমাধান জানতে চাই। নিজে থেকে কখনোই ভাবিনা। বিবিএলটিতে আমরা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে কেস স্টাডি  করতাম। বোঝার চেষ্টা করতাম।  সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান খুজে বের করতাম। সমাধানগুলো আদৌ কতটুকু কার্যকর হবে সেটা নিয়ে ভাবতাম।

আমি ছোটোবেলা থেকেই ভীষণ কথা বলতাম। প্রচুর। কিন্তু এর গন্ডি শুধুই পরিচিত মানুষের মাঝেই ছিলো। অপরিচিত কারো সামনে আমি কথাই বলতে পারতাম না। প্রচুর ভয় লাগতো আমার। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে কিছুই করতে চাইতাম না। এটা যে কত মারাত্মক একটা ভুল সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। নিজের কমফোর্ট জোন থেকে না বেরুতে পারলে জীবনে অনেক সুযোগ আমরা হারিয়ে ফেলি। আর একটা ব্যাপার না বললেই নয়। আমরা প্রায়ই অন্যের ভুল ধরি। তার কাজের সমালোচনা করি। কিন্তু সেটাও যে প্রোডাকটিভ হতে পারে সেটা কখনো ভাবিনি। ” এটা তোমার ভুল হয়েছে” না বলে ” তুমি এভাবে করলে আরো ভালো হতো” এই কথাটা বললে তার ভুলটা শুধরে নিতে সুবিধা হয় বেশি।

পাবলিক স্পিকিংয়ের উপর একটা ক্লাস হয়েছিলো আমাদের। আমরা শিখেছিলাম কথার মাধ্যমে কিভাবে মানুষকে অনুপ্রাণিত করা যায়। একটা আর্ট কম্পিটিশনেরও আয়োজন করা হয়েছিলো। বেশ কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে আমরা ছবি আঁকলাম। আসলে ছবি আঁকার ছলে আমাদের দলীয় কাজ এবং দলে আমরা কি কি ভূমিকা পালন করি সেগুলো  শেখানো হয়েছিলো। সমস্যার ধরণ বুঝে যে সমাধান সেটাও শিখেছিলাম বিবিএলটি ক্লাসে। অ্যাডাপ্টিভ চ্যালেঞ্জ আর টেকনিক্যাল সমস্যার মধ্যকার ফারাকটা বুঝতে পেরেছিলাম আমরা।

এইরকম আরো অনেক বিষয় আমাদের বিবিএলটি ক্লাসে শেখানো হতো।  সমাজের ভিন্ন আর্থসামাজিক আর শিক্ষাব্যাবস্থার মানুষদের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছিলো। জানতে পেরেছিলাম তারা কেমন করে দেশকে নিয়ে ভাবে, সমাজকে নিয়ে ভাবে। আমরা জেনেছিলাম পরিবর্তন করতে চাইলে আগে শুরু করতে হবে নিজের থেকে।

আমাদের বিবিএলটির একটা অংশ ছিলো একমাসব্যাপী কমিউনিটি সার্ভিস। একমাসের এই কমিউনিটি সার্ভিসের প্রজেক্ট ডিজাইন, লোকেশন সিলেক্ট , ফান্ডরাইজিং থেকে শুরু করে ইম্প্লিমেন্টেশন পর্যন্ত প্রতিটি কাজ আমরা নিজেরা করেছি। এতে করে ক্লাসে যা শিখলাম তার প্রয়োগ যেমন হয়েছে তেমনি করে সমাজের একটা সমস্যাকে খুব কাছে থেকে দেখেছি আমরা। একটু হলেও পরিবর্তন আনতে পেরেছি।

সাহস, সহানুভূতি আর যোগ্যতা। এই তিনটি জিনিস আমাদের মাঝে থাকলেই  পরিবর্তন সম্ভব। আমাদের সমস্যা টাকে অনুভব করতে হবে, সমাধানের জন্য একটা পদক্ষেপ নিতে হবে আর নিজেদের করে তুলতে হবে দক্ষ। ক্ষমতা না থাকলেও নেতৃত্ব চর্চার মাধ্যমে অনেক পদক্ষেপ নেওয়াই যায়। এজন্য কিছু দক্ষতা আমাদের প্রয়োজন। আমাদের যেমন বলতে জানতে হবে তেমনি শুনতেও জানতে হবে। বুঝতে হবে পরিবেশকে। বুঝতে হবে সময়কে। সমস্যার ধরণকে। আমাদের ক্লাসগুলিতে এই দক্ষতাগুলো অর্জনের উপর জোর দেওয়া হতো। আমরা নিজেদের নতুন করে চিনেছিলাম। অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম নিজেদের মাঝে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাগুলোকে নতুন করে আবিস্কার করতে।

আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে পরিবর্তন সম্ভব। আর সেটা আমাদের হাত ধরেই আসবে। হয়তো আমরা অনেক কিছু করতে পারবো না। কিন্তু আমাদের ছোট ছোট কাজই আনবে অনেক বড়ো পরিবর্তন। দিন বদলাবেই।